Posted by: xanthis | August 23, 2010

আমাদের রাজপুরুষদের ট্রাফিক আইন মানা, না মানা

https://i0.wp.com/www.bangladeshfirst.com/images/uploaded_images/80.jpg

ঢাকার গুলিস্তানে দ্বিমুখী যানজট (ছবিঃ বাংলাদেশ ফার্স্ট)

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার একেএম শহীদুল হক আফসোস করেছেন এই বলে যে, তিন বা পাঁচ শতাংশ মানুষ আইন ভঙ্গ করতে পারে, কিন্তু ১০০ ভাগ লোক আইন ভঙ্গ করলে পুলিশ কী করবে?

অর্থাৎ কমিশনার সাহেব আইন-শৃংখলার ব্যাপারে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন। এই বিশেষ সময়ে ওনার উদ্বেগের কিছু কারণ অনুমান করা কঠিন নয়। চলছে রমজান মাস। মুসলিম-প্রধান দেশের আর দশটা রাজধানীর মত ঢাকাতেও রমজান মাসে শহর-চরিত্রের বলতে গেলে একটা আমূল পরিবর্তন ঘটে। গুরত্বের বিচারে বাজারদর নিয়ন্ত্রণের ঠিক পরেই অবস্থান নেয় আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি। এমনকি কোন কোন ঘটনার পর এই রমজান মাসে বিশেষ করে ঢাকাতে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতিই হয়ে উঠে সরকারের প্রধান মাথা-ব্যাথা, ২০০৭ সালের রমজানে মলম পার্টির দৌরাত্মে যেমনটা ঘটেছিল।

তবে সাধারণ মানুষের আইন ভঙ্গের প্রবণতার ব্যাপারে ডিএমপি কমিশনার যে বক্তব্যটা দিলেন, তা খুব সম্ভবত তিনি দিয়েছেন ট্রাফিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে। প্রাত্যহিক জীবনে আর কোথাওর চেয়ে রাস্তাঘাটেই একজন নাগরিককে সবচেয়ে বেশী করে এবং প্রায় প্রতিটি মুহুর্তেই আইনের বেড়াজালের মধ্যে থাকতে হয় পথচারী, গাড়ীচালক বা যাত্রী- যে ভূমিকাতেই হোক না কেন। ছোট বা বড় আইন ভঙ্গের ঘটনার সরাসরি প্রভাবটা গিয়ে পড়ে শহরের যানচলাচল পরিস্থিতির উপর, এবং বলতে দ্বিধা নেই, আমরা অর্থাৎ সাধারণ মানুষদের কিছু আইন না মেনে চলাটা রাজধানী ঢাকার যানজটের জন্য বিশেষ ভাবে দায়ী।

ট্রাফিক আইন মেনে চলার প্রসঙ্গ আসলে, এবং সেখানে যদি ঢাকার সাধারণ নাগরিকদের কেউ দোষী করেন (কোন পুলিশ কর্মকর্তা করলে তো কথাই নেই), তাহলে সাধারণ নাগরিকদের অধিকাংশই একটা ব্যাপার অবশ্যই উল্লেখ করবেন। সেটি হচ্ছে, শহরে চলাচলকারী আমাদের রাজপুরুষরা ট্রাফিক আইন কতটা মেনে চলেন।

বর্তমানে আমাদের শাসনব্যবস্থার মধ্যে শুধু ‘রাজনীতি’ শব্দটিতে ছাড়া আর কোথাও ‘রাজ’ শব্দমূলটি পাওয়া যায় না। তাও লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মন্ত্রী-আমলাসহ প্রশাসনের ঊর্দ্ধতন চাঁইদের বোঝাতে প্রায়ই এই ‘রাজপুরুষ’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। এখন কথা হচ্ছে, আমাদের রাজপুরুষরা রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময়ে ট্রাফিক আইন কতটা মেনে চলেন।

যাওয়ার রাস্তায় যানজট থাকলে একটি পুলিশের জিপ বা অন্যকোন গাড়ী আইন ভেঙ্গে পাশের উলটো দিকে যাওয়ার প্রায় ফাঁকা রাস্তাটির ডান পাশ ঘেঁষে এগিয়ে যাচ্ছে, কিংবা একটি পতাকাবাহী গাড়ী (রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ব্যাতীত) যানজট ঠেলে কোনরকমে তার পুলিশ-এসকর্ট সমেত চৌরাস্তা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, যদিও তখনও ট্রাফিক সিগন্যাল এগোবার অনুমতি দেয়নি, ঢাকায় চলাফেরা করতে গেলে এসব দৃশ্য চোখ এড়িয়ে যাবার কোন কারণ নেই। উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গ সমষ্টিগত ভাবে রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে, রাস্তায় নামলে এদের অনেককেই ট্রাফিক আইনের প্রতি ওভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করতে দেখা যায়।

তাহলে ঢাকার যানজটের তীব্রতার পেছনে ‘রাজপুরুষ’-দের ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করার ওসব বিচ্ছিন্ন ঘটনার ভূমিকা কতটুকু। তারা কি আইন ভেঙ্গে ঘটনাস্থলেই একটা যানজটের সৃষ্টি করেন? হয়তো করেন, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের আইন মেনে না চলার ঐ ঘটনাগুলো ঘটনাস্থলে যতটা না প্রভাব ফেলে তার চেয়ে বেশী প্রভাব ফেলে সামগ্রিক বিচারে।

কোন কোন সূত্রমতে ঢাকার জনসংখ্যায় প্রতি বছর বাহির থেকে ১৪ লক্ষ লোক যুক্ত হয়। এই পরিস্থিতিতে ব্যবস্থা না নিলে ভেঙ্গে পড়বার অপেক্ষায় থাকা ছাড়া ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থার আর কিছুর করার থাকবে না।

একজন সাধারণ নাগরিক যিনি কোন বাসে বা প্রাইভেটকারে বা সিএনজি অটোরিকশাতে বসে আছেন এবং অসহনীয় যানজটে ত্যাক্ত-বিরক্ত হচ্ছেন, উলটো দিকে ফাঁকা রাস্তা দিয়ে আইন ভেঙ্গে চলতে থাকা পুলিশের গাড়ীটি সেই নাগরিকের উপর প্রভাব ফেলে সবচেয়ে বেশী। এসব ঘটনার ফলে, আইনকে শ্রদ্ধা করার যতটুকু প্রবৃত্তি সেই নাগরিকের মধ্যে গড়ে উঠেছিল, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা সংস্কার যার বদৌলতেই হোক না কেন, সে প্রবৃত্তি ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে। এই ঘটনার দেখাদেখি যদি তিনিও একটি ট্রাফিক আইন ভেঙ্গে বসেন এবং দ্বিতীয় কোন পুলিশ সদস্যের কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে আইনভঙ্গের ব্যাখ্যা হিসেবে তার সেই পুলিশকে আইন ভাঙ্গতে দেখার অভিজ্ঞতার উল্লেখ করেন, তাহলে তার শাস্তি বিন্দুমাত্র লোপ তো পাবেই না, উপরন্তু তিনি দ্বিতীয় ঐ সদস্যের কাছ থেকে কিছু ভৎসর্না পাবেন, অপমানিতও হতে পারেন। এ পর্যায়ে আইনের প্রতি তার শ্রদ্ধা লোপ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি আরও দ্রুতলয়ে চলতে থাকে। এই শ্রদ্ধা কমতে থাকার ঘটনাটি মূলত যে কুপ্রভাবটি ফেলে, তা হচ্ছে- সেই ব্যাক্তি ও তার মতন অনেকেই ট্রাফিক আইন মেনে চলাটিকে আর অতীব গুরুত্বপূর্ণ কিছু হিসেবে গণ্য করেন না।

এখন, উপরের যত সহজ ও সরল ভাবে প্রক্রিয়াটির ব্যাখ্যা দেয়া হল, সবার ক্ষেত্রে তা ওভাবে নাও ঘটতে পারে। কারও ক্ষেত্রে তা প্রভাব কম ফেলবে, কারও ক্ষেত্রে হয়তোবা ফেলবে বেশী। কিন্তু দিনশেষে যেটা দাঁড়ায়, “আমি রং সাইড দিয়ে গেলে আমাকে কে কী করবে?”, আমাদের রাজপুরুষদের এই চিন্তাধারা ঢাকার ট্রাফিক পরিস্থিতির অবনতির পেছনে বেশ শক্তিশালী ভূমিকাই পালন করে।

তবে একটা ব্যাপার উল্লেখ করতে হয়, একটি গাড়ীর মালিক, জিম্মাদার বা ব্যবহারকারী যিনিই হোন না কেন, রাস্তা দিয়ে গাড়ীটি প্রকৃতপক্ষে চলে তার চালকের ইচ্ছা অনুসারেই। এক্ষেত্রে গাড়ীটিকে আইন ভাংতে দেখলেই নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না যে এটি যিনি ব্যবহার করেন তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন। হয়তো সেই গাড়ীর মালিক বা ব্যবহারকারী রাজপুরুষ আইন ভঙ্গের প্রবণতাকে ঘৃণা করেন, কিন্তু গাড়ীচালক সেই ব্যবহারকারীর অনুপস্থিতিতে তার পেশা, পদ বা অবস্থানের সুযোগ নিয়ে রাস্তায় কোন ট্রাফিক আইন ভাংছে কিনা এবং তার ফলে সামগ্রিক ভাবে কী বিরূপ প্রভাব পড়ছে, সেসব ব্যাপারে যদি তারা একটু মনযোগ দেন,তাহলে হয়তো তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও যানজট নিরসনে কিছুটা ভূমিকা পালন করতে পারবেন।




Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

Categories

%d bloggers like this: