Posted by: comilla | September 1, 2010

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এনারা দুজনই বা বাদ যাবেন কেন?

http://shatil.files.wordpress.com/2010/09/chhatro-league-atrocities-prime-minister-and-2-ministers.jpg

(উপরে) বরিশাল পলিটেকনিক ইন্সটিউটে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। (নীচে) ৩১ আগস্ট, ২০১০ তারিখে জাতীয় শোক দিবস প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের আলোচনা সভার শেষ দিনে ছাত্রলীগের প্রতি সীমাহীন বিরক্তি প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। (ইনসেট) পাট মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকি ও পানি সম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন

ছাত্রলীগের কার্যকলাপে প্রধানমন্ত্রীর বিরক্তি খুব স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ পেল গতকাল ৩১ আগস্ট, ২০১০ তারিখে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত জাতীয় শোক দিবস বিষয়ক আলোচনায়। বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি মূলত ছাত্রলীগের উদ্দেশ্যে ও এই প্রসঙ্গে যা যা বললেন,

কোন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত হলে আইনমাফিক তার শাস্তি পেতে হবে।

সংগঠনে ছাত্রদল ও শিবিরের লোকজনদের ঢুকতে দেয়া যাবে না।

শৃংখলা ভঙ্গকারীদের বহিষ্কার করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে আরও বহিষ্কার করা হবে, আইনভঙ্গকারীকে কোন ছাড় দেয়া হবে না।

একটি স্বল্পশিক্ষিত নেতৃত্ব জাতিকে ভালো কিছু এনে দিতে পারবে না দেশবাসীর সে অভিজ্ঞতা হয়েছ। অতএব পড়াশুনায় আরও বেশি মনযোগী হতে হবে।

ছাত্ররাজনীতিতে বিলাসিতার কোন স্থান নেই। ছাত্ররাজনীতি করতে হলে তা করতে হবে মানুষের সেবা করার উদ্দেশ্য নিয়ে।

আদর্শবিবর্জিত রাজনীতি কোন ভাল ফল বয়ে আনতে পারবে না।

ছাত্রলীগের কেউ অপরাধ করলে তাকে ছাড় দেয়া হবে না, প্রধানমন্ত্রী এই বিশেষ সতর্কবার্তাটির উপর বিশষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। কথা হচ্ছে, এই ছাড় না দেয়ার ব্যাপারটি কি ওনার এই বক্তব্যের সময় থেকে বলবত হল, অর্থাৎ এর আগে কি ছাড় দেয়া হচ্ছিল কি না, সে ব্যাপারে দেশের মানুষ নিশ্চিত ভাবে কিছু বলতে পারে না। কারন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের হল দখলের সময় ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেন নিহত হওয়ার পর প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া, আর এফ. রহমান হল দখলে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আবু বকর সিদ্দিকি নিহত হওয়ার পর প্রশাসনের প্রতিক্রিয়ার তফাত ছিল খুবই দৃষ্টিকটু ভাবে বেশি। যাই হোক, সেই বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে আমরা বরং ছাত্রলীগের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর বিরক্তি ও সতর্কবার্তার উৎকৃষ্টতা অন্বেষণ করি, কিছুটা আশ্বস্ত বোধ করি।

এটা মোটামুটি হলফ করে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল যেভাবে ছাত্রলীগকে সতর্ক করেছেন, আমাদের দেশের আর কোন প্রধানমন্ত্রীকে এর আগে নিজের দলের কোন অঙ্গসংগঠনের প্রসঙ্গে কখনও এ ধরণের অবস্থান নিতে হয় নি। এর আগেও ২০০৯ সালে ছাত্রলীগের অভূতপূর্ব অবাধ্যতা ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বার পর তার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক প্রধান-এর পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। এ ধরণের ঘটনাও সম্ভবত দেশের প্রধান কোন রাজনৈতিক দলের ইতিহাসে ঘটেনি। ছাত্রলীগকে তবুও কেউ দমতে দেখেনি। অব্যাহত থেকেছে দোতলা-তিনতলা থেকে ছুঁড়ে ফেলা, নসরুল্লাহ্‌ ও আবু বকর সিদ্দিকিরা কেউ ভাঙ্গা মেরুদন্ড নিয়ে বা কেউ মাথার পেছনে দেড় ইঞ্চি ব্যাসের ছিদ্র নিয়ে আমাদের ছেড়ে না ফেরার জগতে চলে গেছে।

আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার প্রতি আশা করি দেশের কিয়দাংশ মানুষেরই এই বিশ্বাসটা আছে যে, তিনি যদি সত্যিই চান ছাত্রলীগের রাশ টেনে ধরে যাবতীয় অপকর্ম সাধন থেকে থামাতে, তিনি পারবেন। সেক্ষেত্রে তিনি হয়তো ইতমধ্যেই উপলব্ধি করেছেন যে ছাত্রলীগের মূল্যবোধ সংস্কারের যে প্রক্রিয়াটি এখন একটি অবশ্যকরণীয়, সে প্রক্রিয়াটি সফল করতে হলে ওনাকে ছাত্রলীগের বাইরে এসে মূল সংগঠনটিতেও কিছুটা সময় দিতে হবে, বিশেষ করে তার মন্ত্রীসভায়।

আরেকটু আলোকপাত করি।

অবশ্য বেশি আলোকপাত করার দরকার হবে না। দুটি ইউটিউব ভিডিও এখানে এমবেড করা আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেই দুজনকে তার পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ম দিয়েছিলেন, ভিডিও দুটিতে সেই দুইজন আওয়ামী লীগ নেতাকে বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে। আলোকপাত যা করার তারাই করবেন।

আব্দুল লতিফ সিদ্দিকি

নীচের ভিডিও ক্লিপটি একুশে সংবাদের একটি ফুটেজ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জাতীয় উন্নয়ন বিরোধী কর্মকান্ড শীর্ষক একটি আলোচনায় বক্তব্য রেখেছিলেন পাট ও বস্ত্র মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকি। তার এই বক্তব্যটি ইতমধ্যেই ইন্টারনেটে যথেষ্ট প্রচার পেয়েছে, যেখানে তিনি সাংবাদিক ও আইনজীবিদের উদ্দেশ্য করে বেশ কিছু অশ্লীল ও লেখার অযোগ্য মন্তব্য করেছেন। সেগুলো আপনারা ভিডিওটিতেই দেখে নিবেন। এখানে শুধু ছাত্রলীগের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক অংশটুকু লিখছি। নীচের কথাগুলো আব্দুল লতিফ সিদ্দিকি বলেছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে,

“কোরআন তেলাওয়াত করে সাপের ছোবল থেকে বাঁচা যাবে না। ওর জন্য যা দরকার তাই করতে হবে। নিজেরা নিজেরা মারামারি কর, অদের দুই চাইরটার সাথে মারামারি কর না ক্যান?”

রমেশ চন্দ্র সেন

নীচের ক্লিপটিতে বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে পানি সম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনকে। গত ১২ মে, ২০১০ তারিখে ঠাকুরগাঁও জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল জেলার শিল্পকলা অ্যাকাডেমি মিলনায়তনে। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নিয়ে রমেশ চন্দ্র সেন নীচের বক্তব্যটি এন। লতিফ সিদ্দিকির পুরো বক্তব্যের একটা অংশ ছাত্রলীগের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হলেও, রমেশ সেনের প্রায় পুরো বক্তব্যটাই প্রাসঙ্গিক। ঠাকুরগাঁও জেলার ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন,

“নিয়োগ… এই সবগুলি আমাদের, একআধটা হয়তো স্লিপ হইতে পারে, জানি না ঠিক, ভুলক্রমে, কিন্তু আমাদের। পুলিশের চাকরিতেও তেমনি আমরা দিয়েছি, চেষ্টা করেছি আমাদের ছেলেদের দেওয়ার। আরও, এই যে এই ২০ তারিখে (২০ মে, ২০১০) পুলিশের চাকরির নিয়োগ হবে, অবশ্যই আমরা আমাদের নিজেদের ছেলেদের দেওয়ার ব্যবস্থা করব। তাছাড়া এই সামনে, এই ১৮ তারিখ থেকে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক নিয়োগ হবে, আবার হেডমাস্টার নিয়োগ হবে। এ ব্যাপারে আমরা তথ্য নিচ্ছি। এই তথ্যগুলো নেয়ার পরে, অবশ্যই, আমরা আমাদের ছেলেদের প্রাধান্য দিয়ে কাজ করব।”

আমার এই লেখা ইহজগতে কখনও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গোচরে আসবে কিনা জানিনা, তাও বলি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি ছাত্রলীগকে নিয়ে যত ভাল পরিকল্পনাই করুন না কেন, আপনার সেই পরিকল্পনাগুলো ভেস্তে দেয়ার জন্য আপনার ভাষ্যমতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির যতটা ভূমিকা রাখতে পারত, তার চেয়ে বহু গুণে বেশি ভূমিকা ইতমধ্যেই রেখে ফেলেছেন আপনারই দলের দুজন শীর্ষ নেতা, যাদের উপরের আপনার ভরসা শুধু দলভিত্তিক নয়, এদের উপর ভরসা করে আপনি এদেরকে দুটো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ম দিয়েছেন।

এদের একজন আপনার অনুগত ছাত্রদের বলছে অন্য দলের ছেলেদের সাথে মারপিট করতে, আরেকজন বলছে তারা যাই করুক না করুক না কেন সরকারি সব চাকরি তাদের জন্য রেখে দেওয়া হচ্ছে।

রাজনীতি ও অপরাধ নিয়ে নির্মিত সিনেমা নাটকগুলোতে আমরা দেখি খল চরিত্রগুলো টগবগে তরুণদের অপরাধের জগতে আরও গভীরে তলিয়ে যাবার জন্য এগিয়ে দেয়। তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়, তাদেরকে উত্তপ্ত করে তুলে শত্রু নিধনের জন্য। টগবগে তরুণদের ব্যবহার করে শত্রু নিধনের ঘটনা বাস্তবেও ঘটে বেশি, সিনেমা নাটকগুলোতে সেগুলোরই প্রতিফলন হয়। সিনেমা নাটকে সেসব খল চরিত্রগুলোকে যতটা সহজে দেখিয়ে দেয়া হয়, বাস্তবে তাদের নাগাল পাওয়া সহজ হয় না। গোপন স্থানে বসে বাস্তব জীবনের সেসব খল চরিত্র কীভাবে একটি নিষ্পাপ তরুণকে অপরাধ করার জন্য উৎসাহ দিচ্ছে, সেসব দেখবার সুযোগ একজন সাধারণ নাগরিকের হয় না।

আব্দুল লতিফ সিদ্দিকি সাধারণ নাগরিকদের জন্য সেই চিত্রটি সর্বসমক্ষে এনে দিলেন।

ভিডিও ক্লিপটিতে দেখুন কীভাবে একজন বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতা তার দলের তরুণদের প্রতি অন্যকে হামলা করার পরামর্শ দিচ্ছেন। পশ্চিমা বিশ্বে যে ধরণে্র দৃশ্য গোপনে ধারণ করে জনসমক্ষে এনে দিলে সেই রাজনীতিকের রাজনৈতিক জীবনের ইতি ঘটত চোখের পলকে, সে রকম একটি দৃশ্য আমাদের দেশে সবকটি টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা একযোগে ধারণ করে সবার সামনে তুলে ধরল, কিন্তু এখনও “নিজেরা নিজেরা মারামারি কর, অদের দুই চাইরটার সাথে মারামারি কর না ক্যান?” বক্তব্য দেয়া রাজনীতিকের কিছু হয়নি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ছাত্রলীগের কর্মীদের বলেছেন, লেখাপড়ায় আরও মনযোগী হতে। ঐ কথা মা-বাবা ও শুভানুধ্যায়ী নিকটাত্মীয় অভিভাবক ছাড়া তাদের আর কেউ বলে না। দোতালা, তিনতালা থেকে ফেলে দেওয়ার দৃশ্য দেখে হয়তো মা-বাবাও সেকথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু আপনি বলেছেন। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, তারা যে ইতমধ্যেই জেনে গিয়েছে যে পড়াশুনো না করলেও তাদের জন্য পুলিশে, প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক এমনকি প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাকরির ব্যবস্থা করা আছে, তাদের কি আর লেখাপড়ায় ফেরানো সহজ হবে?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি তো তাদের বলেছেন অপরাধ করলে আইনমাফিক ব্যবস্থা থেকে তাদের আর কেউ বাঁচাতে পারবে না। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার মন্ত্রীসভার সদস্য রমেশ চন্দ্র সেনের কাছ থেকে তো তারা ইতমধ্যে জেনেছে যে তাদের অপকর্ম নিয়ে বেশী আলোচনা করলে চ্যানেল ওয়ানের মত আরও কিছু চ্যানেল বন্ধ হয়ে যাবে। রমেশ চন্দ্র সেন তো আপনার সরকারের ব্যাপারেই বললেন, সরকার নাকি এরকম আরও কিছু চ্যানেল বন্ধ করার জন্য চেষ্টা করছে। পাশাপাশি লতিফ সিদ্দিকি তাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন, নিষ্কর্ম বসে থেকে কোন লাভ নেই, যার জন্য যেটা প্রযোজ্য তার সাথে সেটাই করতে হবে। নিজে নিজে মারামারি বন্ধ করার কথাই তিনি বলেননি, তিনি বলেছেন তারা যেন অন্যান্য দলের ছেলেদের সাথেও মারপিট করে। তো, ছাত্রলীগের যারা ঐ দুই মন্ত্রীর কথা শুনে একটু হলেও উজ্জীবনের সন্ধান পেয়েছে, তাদের ফেরানো কি সহজ হবে? তাদের ফেরাতে হলে আগে আপনার এই মন্ত্রী দুজনের সাথে আপনার একটা বিহিত হওয়ার দরকার নয় কি?


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

Categories

%d bloggers like this: