Posted by: comilla | September 3, 2010

সে হাসি আজও মলিন হয়নি, বরং আরও ঝলমলে হয়েছে

১৯৯৪ সাল। মাত্র কিছুদিন হল গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছি, মাত্র কয়েকদিন ক্লাস হয়েছে। এক বিকালে রমিজউদ্দীন মোল্লা স্যার আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমি দিবা শাখা না প্রভাতি শাখা। গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে আমি ছিলাম উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র। সেখানে তো নয়ই, এর বাইরেও আমাকে তখন পর্যন্ত কেউ দিবা আর প্রভাতির অর্থ শেখায়নি। তাই স্যারের প্রশ্নের জবাবে “জানি না” বলা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। জানি না বলার সঙ্গে সঙ্গেই পাশে বসে থাকা প্রায় ১৫/২০ জন ছেলেপেলের সেই কি হাসাহাসি। এই আজব চিড়িয়াটিকে নিয়ে, অর্থাৎ আমাকে নিয়ে তারা কিছুক্ষণ আগেই কিছুটা নাড়াচাড়া করেছে। এই পর্যায়ে দিবা-প্রভাতি না জানার মূর্খতা দেখে আর হাসি আটকাতে পারল না। হাসির সাথে সাথেই অবশ্য মোল্লা স্যার একটি বেত নিয়ে গিয়ে তাদের উপর এক প্রস্থ সেরে এলেন। তবে সিরিয়াস কোন মারপিট নয়। মারটা বলা যেতে পারে সেই হাসির তোড়েরই একটা অংশ।


“জানি না” বলার ফলে যে হাসির সৃষ্টি হয়েছিল, সেই হাসিকে আজও আমি গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলে আমার অভ্যর্থনা হিসেবে গণ্য করি। সে হাসি আজ পর্যন্তও মলিন তো হয়ই নি, বরং আরও ঝলমলে হয়েছে।


সে বছরেরই শেষ দিকে, ক্লাস টু-এর বার্ষিক পরীক্ষা দিতে গিয়ে আমি আরেকটি ঘটনা ঘটিয়েছিলাম। বিজ্ঞান পরীক্ষার আগের দিন আম্মু আমাকে পাখিপড়ার মত করে পানি-চক্র শিখিয়েছিল। আমি শিখেওছিলাম। পরীক্ষার হলে যাবার আগে আম্মু পইপই করে বলে দিয়েছে পরীক্ষায় পানি-চক্রটা আসলে যেন ঠিকঠাক লিখি।


পরীক্ষায় পানি-চক্র এল। প্রশ্নটা ছিল খুবই সহজ করে লেখা- চিত্রসহ পানি চক্র বর্ণনা কর। তো দিবা-প্রভাতির মত “বর্ণনা” শব্দটিও তখন পর্যন্ত আমার কাছে অচেনা, স্বাভাবিক কথাবার্তার ছলেও কারও কাছে শুনেছি বলে মনে পড়ল না। স্কুলের মসজিদের উলটো দিকে যে বড় রুমটা কিছুদিন পর (আজ থেকে অন্তত দেড় দশক আগে) লাইব্রেরীর জন্য ছেড়ে দেয়া হয়েছিল, তার পাশের বড় আরেকটা রুমে আমার সিট পড়েছিল। সেই রুমে বসে আমি আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগলাম এই বর্ণনা শব্দটার মানে কী।


এই বর্ণনা শব্দের অর্থ না জানার কারণে, স্যারদের ভাষায় “ছাক্কা নাম্বার”-এর প্রশ্ন ঐ পানি-চক্র আমি পরীক্ষায় লিখে দিয়ে আসতে পারলাম না।


বেরিয়ে এসে আম্মুকে প্রশ্ন দেখাতে আম্মু খুব খুশি হয়ে গেল পানি-চক্র এসেছে দেখে। আমি ঠিকঠাক লিখে আসতে পেরেছি কিনা জিজ্ঞেস করতেই আমি গুরুতর সেই সমস্যাটা ব্যাখ্যা করলাম। আম্মু শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার হাসি দিয়ে বলল, “ধুরো ব্যাটা, বর্ণনা মানে তো বলসে পুরাটা লিখতে!” এই প্রসঙ্গে আমাকে তেমন ভৎসর্না না করার কারন হচ্ছে, আম্মু জানত যে তার এই কনিষ্ঠ পুত্রটির বাংলা ভাষাজ্ঞান-এর হাল বেশ করুণ।


এগুলো সবই হচ্ছে আমাদের ধীরে ধীরে ল্যাবরেটরিয়ান হয়ে ওঠার গল্প। এখন তো চোখ বন্ধ করে বাংলা লিখি। লেখার পর সেটা যেমনই হোক, বাংলা লিখতে-বলতে-বুঝতে আমাদের এখনকার যে স্বাচ্ছন্দ্য, তার পেছনের একমাত্র ও অনন্য অবদান হচ্ছে গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের।


সেই প্রিয় গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের আজ ৪৯তম জন্মদিন।


এই ফাঁকে স্কুলের নামের ব্যাপারে একটি ব্যাপার পরিষ্কার করে নেই। স্কুলটির নাম গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল এবং এটি একটি পুরো সরকারি স্কুল। এই পর্যায়ে স্কুলের নামের “গবর্নমেন্ট” অংশটিকে অনেকে সরকার বলে মনে করে থাকতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে কিন্তু তা নয়। শিক্ষাব্যবস্থার উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্যে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে যেসব গবেষণা হয়, সেগুলোর পরীক্ষাগার হিসেবে এই স্কুলটি গড়ে উঠেছিল, তা হয়তো অনেকেই জানেন। স্কুলের নামের “ল্যাবরেটরি” অংশটি যে সেই অর্থই বহন করছে তাও প্রায় সবার জানা। কিন্তু গবর্নমেন্ট অংশটির তাৎপর্য প্রসঙ্গে আমাদের অনেকেই তেমন অবগত নই বলেই আমার বিশ্বাস। এই “গবর্নমেন্ট” শব্দটি দিয়ে প্রকৃতপক্ষে “তত্ত্বাবধান” বোঝানো হয়েছে। সে হিসেবে, ছাত্রদের সুষ্ঠু উপায় তত্ত্বাবধানের জন্য ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের উদ্ভাবিত পদ্ধতিগুলোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা যেখানে করা হয়, সেটিই হচ্ছে আমাদের প্রিয় গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল।


গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের ৪৯তম জন্মদিনে শ্রদ্ধা জানাই স্কুলটির প্রবাদপ্রতিম শিক্ষকদের প্রতি যারা তাদের ব্যাক্তিত্ব দিয়ে স্থান করে নিয়েছেন তাদের প্রত্যেকটি ছাত্রের হৃদয়ের গভীরে, বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই আমাদের জেষ্ঠ্যজনদের, আমাদের “বড়ভাই”-দের, যারা তাদের কর্মময় জীবন ও স্কুলের প্রতি তাদের গভীর ভালোবাসার মাধ্যমে আমাদের জন্য পথ দেখিয়ে গেছেন ও যাচ্ছেন।


একজনকে একটু বিশেষ ভাবে শ্রদ্ধা জানাতে হয় বলেই তাঁর প্রসঙ্গে আলাদা করে লিখতে হচ্ছে। তিনি হচ্ছেন আমাদের প্রিয়তম এই শিক্ষাঙ্গনটির প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক খান মুহম্মদ সালেক। খান মুহম্মদ সালেক-কে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে কৃতি ল্যাবরেটরিয়ান ও আমাদের শ্রদ্ধেয় জেষ্ঠ্যজন ড. এম.এ. মোমেন যেটুকু লিখেছেন, আমার মনে হয় না এটির চেয়ে যথাযথ প্রকাশ আর হতে পারে-


“অনেক ব্যর্থতা আর গ্লানির মধ্যে এখনো ভাবি, স্যার যদি একবার এসে আমাদের জীবনের চারপাশ দিয়ে ঘুরে যেতেন, আবার নতুন করে বিদ্যুতায়িত হতাম, শক্তি সঞ্চিত হত অপার। আমার প্রধান শিক্ষক, আমাদের কালের প্রধান শিক্ষক, খান মুহম্মদ সালেক কি কখনো মৃত্যুবরণ করতে পারেন?”


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

Categories

%d bloggers like this: