Posted by: comilla | September 23, 2010

বিদেশী কুটনীতিকের বরাত দিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টির আরেকটি ব্যার্থ চেষ্টা প্রথম আলোর

বিএনপির প্রতিষ্ঠা লাভের প্রক্রিয়াটিকে নিয়ে ভেবে প্রথম আলোর মিজানুর রহমান খান যে অনেক মূল্যবান সময় ব্যয় করেছেন, সেটা প্রথম আলোয় প্রকাশিত তার “বিএনপির জন্ম যেভাবে সেনানিবাসে” সিরিজটি পড়ে বোঝা যায়। অবশ্য গবেষণা ছাড়া আকস্মিক ভাবে কিছু সূত্রের সন্ধান বা কোন নির্দেশনা পেলেও বহু আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার উদ্যোগ কেউ কেউ নিতে পারেন। মিজানুর রহমান খান কোনটি করেছেন জানি না।

মিজানুর রহমান খানের প্রতিবেদনটিতে দেখা যাচ্ছে, বিশেষ কিছু শব্দের উপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। আমি জানি না সেগুলো কি মিজানুর রহমান খানের কি-ওয়র্ড ছিল কিনা। তবে এটা হলফ করে বলা যায়, পাঠকরা সেসব কি-ওয়র্ড নিমেষেই শনাক্ত করবেন। কি-ওয়র্ড-এর প্রসঙ্গে একটু পরে আসি। প্রতিবেদনটিতে তুলে ধরা তথ্যগুলোর সূত্র প্রসঙ্গে কিছু বলার ছিল, সেগুলো আগে বলে নেই।

http://firstcache.files.wordpress.com/2010/09/stephen-eisenbraun.jpg

স্টিফেন আইজেনব্রাউন

প্রতিবেদনটি পড়ে জানা যায়, বিএনপির প্রতিষ্ঠা লাভের প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে উল্লিখিত তথ্যাবলীর উৎসগুলো হচ্ছে মূলত- ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের তৎকালীন এক কর্মী (পলিটিকাল কাউন্সেলর), প্রয়াত ন্যাপ নেতা মশিউর রহমানের ভাই ও ছেলে এবং বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। প্রতিবেদনের দুটি মুখ্য অংশের তথ্যের উৎস হচ্ছেন মার্কিন দূতাবাসের সেই কর্মী স্টিফেন আইজেনব্রাউন এবং ন্যাপ নেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়ার ভাই মোখলেসুর রহমান। এদের মধ্যে আইজেনব্রাউনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যগুলো মিজানুর রহমান সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে সংগ্রহ করেননি। সেগুলো সংগৃহীত হয়েছে ২০০৪ সালে আইজেনব্রাউনের সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী এক তৃতীয় ব্যাক্তির কাছ থেকে, ইমেইল বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে।

চার্লস স্টুয়ার্ট কেনেডির নেয়া আইজেনব্রাউনের ঐ সাক্ষাৎকারের সূত্র ধরে বেশ কিছু ব্যাক্তির সাথে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কথোপকথনের বিশদ বিবরণ প্রতিবেদনটিতে তুলে ধরা হয়েছে, যেগুলো পড়ে অনেকেরই ভ্রম হতে পারে সেগুলো কোন ভিডিও ক্লিপ দেখে বা অডিও ক্লিপ শুনে লেখা হয়েছে। ভ্রম হওয়ার ব্যাপারটি প্রাসঙ্গিক নাও হতে পারে, কেননা সেসব ভিডিও বা অডিও ক্লিপ মিজানুর রহমানের কাছে থেকে থাকতে পারে, কিংবা থাকতে পারে জিয়ার সাথে একান্ত আলোচনায় অংশ নেয়া সেই ব্যাক্তিদের কারও না কারও স্বীকারোক্তি। মিজানুর রহমান খান প্রতিবেদনে বলেননি যে সেগুলো তার কাছে নেই। তবে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, মিজানুর রহমান এটাও বলেননি যে নির্ভরযোগ্য সেই উৎসগুলোর কোনটি তার কাছে আছে। বললে আমরা পাঠকরা একটু নিশ্চিন্ত মনে তথ্যগুলো গলধঃকরণ করতে পারতাম।

প্রতিবেদন পড়ে জানা যায়, জিয়ার সাথে একান্তে হওয়া আলোচনার বিষয়ে যেসব তথ্য মিজানুর রহমান দিয়েছেন, সেসব তথ্যর মূল উৎস হচ্ছে ন্যাপ নেতা মোখলেসুর রহমান যাদু মিয়া।  এটা বোধগম্য যে ১৯৭৯ সালে মৃত্যুবরণ করা যাদু মিয়া এসব তথ্য সরাসরি মিজানুর রহমানকে দেননি, কেননা দিলে প্রতিবেদনে তার উল্লেখ থাকত। যাদু মিয়া সেসব কথা বলেছিলেন আইজেনব্রাউনকে (একান্তই আইজেনব্রাউনের ভাষ্য মতে)। এই আইজেনব্রাউনও তথ্যগুলো মিজানুর রহমানকে (সরাসরি যোগাযোগ করা সত্তেও) দেননি, দিয়েছিলেন চার্লস স্টুয়ার্ট কেনেডিকে, ২০০৪ সালে দেয়া এক সাক্ষাতকারে। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৬-৭৮ সালে ঘটা সেসব ঘটনার বিস্তারিত তথ্য তিনবার হাত বদল হয়ে মিজানুর রহমান খানের কাছে এসে পৌঁছেছে কেনেডি সাহেবের মারফত, গত ৩০শে আগস্টে পাঠানো এক ইমেইলের মাধ্যমে। সেই মতে, মিজানুর রহমান খানের প্রায় ছয় হাজার শব্দবিশিষ্ট ঐ প্রতিবেদনটির একটা উল্লেখযোগ্য অংশেরই সূত্র হচ্ছে কেনেডি সাহেবের কাছ থেকে তিন সপ্তাহ আগে পাওয়া সেই ইমেইলটি।

কথোপকথন আর তার সূত্রের ব্যাপারে যা বলছিলাম- তো, প্রতিবেদনটিতে জিয়াউর রহমানের সাথে এরশাদ, জেনারেল মঞ্জুর, যাদু মিয়া ও তৎকালীন এনএসআই প্রধানের কথোপকথন রীতিমত ইনভার্টেড কমা সহকারে যোগ করা হয়েছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে লঘু মেজাজে বলা (অন্তত পড়ে তাই মনে হল) কথাও যোগ করা হয়েছে গুরুত্বের সাথে। তো, বক্তাদের একজনের সাথেও সরাসরি যোগাযোগ না করে, দ্বিতীয়ও তো নয়ই, তৃতীয়ও নয় বরং চতুর্থ পর্যায়ের একটি সূত্রের ভিত্তিতে পাওয়া বর্ণনাগুলোকে একেবারে ইনভার্টেড কমা সহকারে উল্লেখ করা হলে তার গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু হবে, এই প্রশ্ন বিজ্ঞজনদের কাছে রাখলে আশা করি দোষের কিছু হবে না। বিশেষ করে প্রতিবেদনে একাধিক বার “নাকি” শব্দের ব্যবহার (“তিনি নাকি বলেছিলেন”, “এরশাদ প্রথমেই নাকি বলেছেন” ইত্যাদি) সম্ভবত এই গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নটিকে জোরদার করবে।

আইজেনব্রাউনের সাথে মিজানুর রহমানের কোন তথ্য আদান-প্রদান না হলেও ন্যাপ নেতা মশিউর রহমানের ভাই মোখলেসুর রহমান আর ছেলে আনোয়ারুল গনির সাথে তিনি নিজেই কথা বলেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। মওদুদ আহমেদের সাথেও কথাবার্তা হয়েছে সরাসরি ভাবে।

ভাবছেন উৎসের লম্বা ফিরিস্তি টেনে এখন সেগুলোর নির্ভরযোগ্যতা, কিংবা সেগুলোর ভিত্তিতে এত বড় একটি বিষয় নিয়ে একেবারে ‘অনুসন্ধানী প্রতিবেদন’ লিখে সেরে ফেলার যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা করব? না, তা নয়। উৎস গুলো উল্লেখ করলাম আসলে অনেকটা নিজের সাথে কথোপকথনের মত করে। কেননা পুরো সিরিজটা পড়ে সবগুলো তথ্যসূত্রের স্পষ্ট পরিচয় পেতে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে।

এইবার কি-ওয়র্ডের প্রসঙ্গে আসা যেতে পারে। কি-ওয়র্ডগুলো কী কী? প্রতিবেদনটিতে এমনকি চোখ বোলালেও শনাক্ত করা যায়- সেনানিবাস, সেনাছাউনি, সেনানিবাসের বাড়ি, গভীর রাত, গোপন বৈঠক এবং গোপন আলোচনা, এই কয়েকটি শব্দের উপর বিশেষ জোর দেয়া আছে। আরেকটি শব্দ রয়েছে, সেটি হচ্ছে ষড়যন্ত্রমূলক। একটা ব্যাপার দেখে মজা না পেয়ে পারা গেল না। মিজানুর রহমানের এই ‘অনুসন্ধানী’ সিরিজের শেষ কিস্তিটির শিরোনাম হচ্ছে, “সেনাছাউনিতে বিএনপির জন্মকে ষড়যন্ত্রমূলক বলেন আইজেনব্রাউন”। অথচ ঐ পুরো কিস্তিটিতে ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র একবার, এবং বলেছেন মার্কিন দূতাবাসের কর্মী আইজেনব্রাউন। অথচ কেন ষড়যন্ত্র, কীভাবে ষড়যন্ত্র এবং কিসের ষড়যন্ত্র, সেটির উল্লেখ আইজেনব্রাউন করেননি, স্পষ্ট ভাবে লেখেননি মিজানুর রহমান খানও। বরং প্রতিবেদনটি পড়ে কেউ যদি অভিযোগ তুলেন যে দুর্বল বা অস্পষ্ট সুত্রের ভিত্তিতে দেয়া তথ্যগুলোর পরিবেশনায় প্রেসিডেন্ট জিয়ার প্রতি কলঙ্ক লেপনের প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে, তবে সেই অভিযোগকারীর দাবীকে নস্যাৎ করার মত খুব জোর হয়তো আমরা পাব না।

এক্ষেত্রে আরেকটি ব্যাপারে আলোকপাত করতে হয়। আইজেনব্রাউন নাকি বলেছেন বিএনপির প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াটি ষড়যন্ত্রমূলক ছিল। মিজানুর রহমান খানের মতে (আসলে কেনেডি সাহেবের মারফত আইজেনব্রাউনের মতে) সেই ষড়যন্ত্রের মূল হোতা নাকি ছিলেন বিএনপির বর্তমান স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। কথা হচ্ছে, মওদুদ আহমেদের সাথে সাক্ষাত করেছেন বলে মিজানুর রহমান খান তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন। শেষ কিস্তিতে একটি কথোপকথনও তুলে ধরেছেন। এই পর্যায়ে, যারা মিজানুর রহমান খানকে ইতমধ্যেই একজন সাহসী সাংবাদিক হিসেবে শনাক্ত করে ফেলেছেন, তাদের মনে এই প্রশ্নের উদয় হতে পারে যে, মিজানুর রহমান খান মওদুদ আহমেদকে ষড়যন্ত্রের হোতা হওয়ার ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না কেন। হলফ করে বলতে পারি না এই প্রশ্নটি করার সাহস তিনি যুগিয়ে উঠতে পারেন নি। সেক্ষেত্রে প্রশ্নটি যদি করেই থাকেন, তবে প্রতিবেদনে কেন তার উল্লেখ নেই, সেটি ভেবে অনেকেই নিজেকে বঞ্চিত মনে করছেন।

http://firstcache.files.wordpress.com/2010/09/president-zia-630px.jpg

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কোন বর্ণবাদী সংগঠন তো নয়ই, কোন সন্ত্রাসী সংগঠনও নয়। এটি একটি রাজনৈতিক দল, যেটি প্রতিষ্ঠা করার কয়েক বছর পর জিয়ার মৃত্যু হয়েছিল এবং তারও প্রায় এক দশক পর দলটি জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছিল। তো, প্রতিষ্ঠালগ্নে একজন রাষ্ট্রনায়ক এই প্রসঙ্গে নানান দৃষ্টিভঙ্গির রাজনীতিবিদদের সাথে দেখা করেছেন, তাদের সাথে বৈঠক করেছেন। সেই বৈঠকগুলোতে পরিকল্পতি দলটির সম্ভাব্য নীতিমালা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, মিজানুর রহমান খানই তার প্রতিবেদনে সেসব উল্লেখ করেছেন। এক্ষেত্রে সেসব বৈঠকগুলোকে বা বিএনপির প্রতিষ্ঠালাভকে কেন ষড়যন্ত্রমূলক বলা হবে, সে ব্যাপারে মিজানুর রহমান খান স্পষ্ট ভাবে কোন ব্যাখ্যা তো দেনই নি, বরং মার্কিন দূতাবাসের তৎকালীন এক কর্মী, যার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করেও তিনি বিস্তারিত কিছু জানতে পারেননি, জানতে হয়েছে তৃতীয় এক ব্যাক্তির মাধ্যমে, এই আইজেনব্রাউনের একটি উক্তির ভিত্তিতেই তিনি তার প্রতিবেদনের শেষ কিস্তির শিরোনাম নির্বাচন করেছেন “সেনাছাউনিতে বিএনপির জন্মকে ষড়যন্ত্রমূলক বলেন আইজেনব্রাউন”। এই নির্বাচন কি ঠিক হয়েছে কিনা তা বিজ্ঞজনেরা বিচার করবেন। তবে প্রশ্ন রাখতে যেহেতু দোষ নেই, আমরা প্রশ্ন রাখছি।

গভীর রাত শব্দটির বহুব্যবহার প্রসঙ্গেও কিছু বলা যেতে পারে। জিয়াউর রহমান ছিলেন রাষ্ট্রনায়ক। যে স্টিফেন আইজেনব্রাউনকে উদ্ধৃত করে মিজানুর রহমান খান বিএনপির প্রতিষ্ঠালাভকে একটি ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, সেই স্টিফেন আইজেনব্রাউনের বিবরণেই বলা আছে, জিয়া ছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক, যিনি একজন সামরিক কর্মকর্তা থেকে নিজেকে সফল ভাবে রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ মার্কিন কূটনীতিক ক্রেইগ ব্যাক্সটারকে উদ্ধৃত করে এও বলা হয়েছে, রাজনীতিবিদ হিসেবে সক্রিয় হওয়ার পর জিয়া ব্যাপকভাবে দেশসফর করেন এবং খুব সম্ভবত শেখ মুজিবর রহমান ও এ.কে. ফজলুল হকের চেয়েও বেশিমাত্রায় বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল সফর করেছেন। এতে প্রকাশ পায় যে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জিয়া কঠোর পরিশ্রমী ছিলেন। এই পরিস্থিতিতে সারাদিনের পরিশ্রম শেষে বিশ্রামের জন্য নির্ধারিত রাতগুলোতেও অনেক সময় তিনি রাজনীতিবিদদের সাথে নীতিনির্ধারণী বৈঠক করছেন, সম্ভাব্য রাজনৈতিক দলের রূপরেখা নির্ধারণ করছেন, এতে জিয়ার একনিষ্ঠতা ও কঠোর পরিশ্রমের দিকটি নির্দেশপূর্বক সেগুলো প্রশংসনীয় না হয়ে কেন পুরো ব্যাপারটাই মিজানুর রহমানের কাছে ষড়যন্ত্রের একটি ইঙ্গিত হয়ে ধরা দিল, তা তিনি তার প্রতিবেদনে সম্ভবত স্পষ্ট করে উল্লেখ করেন নি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যাদু মিয়ার মৃত্যুটি তার পরিবারের কাছে রহস্যাবৃত। মিজানুর রহমান খান যাদু মিয়ার ভাই মোখলেসুর রহমান ও ছেলে আনোয়ারুল গনির সরাসরি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, এবং ধরে নেয়া যায় তাদের বক্তব্যের অনেকাংশই হুবহু তুলে ধরেছেন। সেসব বক্তব্যের একটিতেও তারা যাদু মিয়ার মৃত্যু প্রসঙ্গে কোন রহস্যের ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে দেখা গেল না। হয়তো তারা মিজানুর রহমান খানকে একান্তে বলেছেন, হয়তো মিজানুর রহমান খান সেটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন নি। কিন্তু তিনি যাদু মিয়ার মৃত্যুর একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনাও তিনি দেননি, দেননি তার মৃত্যুর তারিখ, দেননি কেন সেটিকে ঘিরে রহস্যের অস্তিত্ব থাকতে পারে তার এক লাইন ব্যাখ্যাও। যাদু মিয়ার মৃত্যু প্রসঙ্গে মোখলেসুর রহমানকে একটু বর্ণনা করতে দেখা গেল, সেখানো রহস্যের কোন সন্ধান পাওয়া গেল না। এই প্রসঙ্গে একটা কথাই বলার আছে, যাদু মিয়ার মৃত্যুটি তার পরিবারের কাছে রহস্যাবৃত থাকবার ব্যাপারটি তিনি উল্লেখ যেহেতু করেছেন, তার একটি অতিক্ষুদ্র ব্যাখ্যাও হয়তো তিনি দিতে পারতেন, সেক্ষেত্রে আমরা একটা নূন্যতম ধারণা হলেও পেতে পারতাম। তিনি দেননি।

সেনাবাহিনী, সেনানিবাস ও সেনাছাউনি -এসব শব্দের বহুব্যবহারের প্রেক্ষিতে যেটি বলতে চাই, তা হয়তো শুধুমাত্র মিজানুর রহমান খানের এই প্রতিবেদনের ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক নয়, বরং বলা যেতে পারে প্রতিবেদনটির প্রকাশস্থল প্রথম আলো পত্রিকার ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক।

http://firstcache.files.wordpress.com/2010/09/matiur-rahman1.jpg

নীতি বিসর্জন দিয়ে বেকায়াদায় পড়ে মাপ চাওয়ার ঘটনা মতিউর রহমানের এই প্রথম নয়।

আমরা জেনেছি গত ৩রা সেপ্টেম্বার, ২০১০ তারিখে পত্রিকা-মালিকদের সংগঠন নোয়াব-এর নেতাদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতকালে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান ১/১১ শাসনামলে তার পালিত ভূমিকার জন্য কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর সরাসরি হস্তক্ষেপের সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক অধ্যায়টি ছিল এই ১/১১, যা ২৯ ডিসেম্বার, ২০০৮ তারিখে অনুষ্ঠিত নির্বাচন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। অসাংবিধানিক ও অবৈধ এই সরকারটির কার্যক্রম চলাকালীন প্রথম আলো দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যে বিশেষ নীতি গ্রহণ করেছিল, সেই নীতিটি অনেকাংশেই ছিল সেনাসমর্থিত ও সেনানিবাস থেকে পরিচালিত ঐ অগণতান্ত্রিক সরকারকে সমর্থনের নামান্তর। সেসময় দেশের বিরাজনীতিকরণের যে প্রক্রিয়া একটি বিশেষ গোষ্ঠী শুরু করে তার বাস্তবায়ন করছিল, তার সমর্থনে প্রথম আলো একাধিক মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত প্রতিবেদনটি হচ্ছে ১১ জুন, ২০০৭ সালে প্রকাশিত “দুই নেত্রীকে সরে দাঁড়াতে হবে”। এটি লিখেছিলেন সম্পাদক মতিউর রহমান নিজেই।

প্রতিবেদনটিতে তিনি ১/১১ সরকারের গণধিকৃত মাইনাস-টু ফর্মুলার সমর্থনে বহু শব্দ ব্যায় করেছেন। ঐ সময় প্রথম আলোর পাঠক যারা ছিলেন তারা তো বটেই, পরে আরও অনেকেই সমালোচিত ও বিতর্কিত এই মন্তব্য প্রতিবেদনটি পড়েছেন। মন্তব্য প্রতিবেদনটি পড়ে যে উপলব্ধিটা অনেকের মাঝেই এসেছিল, যেটা প্রধানমন্ত্রীর কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে হয়তো এই মুহুর্তে মতিউর রহমান নিজেও স্বীকার করবেন, যে, মতিউর রহমান ১/১১-এর বিরাজনীতিকরণ চেতনার প্রতি পুরোপুরি সমর্থন জানিয়েই নিজের অবস্থান নির্ধারণ করেছিলেন, সেই সাথে করেছিল প্রথম আলো। বিশেষ প্রতিবেদনটি পড়ে সহজেই এটা মনে হওয়া সম্ভব, তিনি যেন অনেকটা তাড়াহুড়োর মত করে দুই নেত্রীকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য যতটা সম্ভব বিবরণ সেই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছেন।

১/১১-এর সময়ে মতিউর রহমান এবং তার প্রথম আলো যে ভূমিকা পালন করেছিল, সহজেই বোধগম্য হয় যে ১/১১-এর অগণতান্ত্রিক নীতির প্রতি, বিশেষত মাইনাস টু ফর্মুলার প্রতি তাদের তীব্র সমর্থন না থাকলে ঐ ধরণের ভূমিকা নেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হত না। এখন প্রথম আলোর পক্ষে কোন ব্যাক্তি বা স্বয়ং মতিউর রহমান জবাবে বলতে পারেন, তাদের ভূমিকা ঐ সময়ে এমন ছিল না যাতে সে কথা মনে হতে পারে। সেক্ষেত্রে বলতে হয়, তারা তো পত্রিকা চালান, পত্রিকায় মন্তব্য লেখেন, তারা সেগুলো করেন নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। কিন্তু অবশেষে সব মিলিয়ে ব্যাপারটি দেখতে কী রকম হচ্ছে বা তাদের পরিবেশিত সংবাদ ও মন্তব্যের দ্বারা পাঠকদের মাঝে পত্রিকার নীতিমালা প্রসঙ্গে কী ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে, এটা অবশ্যই তাদের চেয়ে আমরা অর্থাৎ পাঠকরা ভালো বলতে পারব। সেক্ষেত্রে ১/১১-এর সময়ে প্রথম আলোর পালিত ভূমিকা যে সৎ সাংবাদিকতার আদর্শবিবর্জিত ছিল এবং বিতর্কিত ছিল, এটি কেউ দাবী করলে সম্ভব তার প্রতি আর রাগ দেখানো চলে না।

http://firstcache.files.wordpress.com/2010/09/prothom-alo.jpg

নীতিবিসর্জনের জন্য একবার ক্ষমা চাওয়া প্রথম আলো পত্রিকার বিশ্বাসযোগ্যতা ও সাংবাদিক সততা এখন কতটা প্রশ্নাতীত, সে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, মতিউর রহমানের সেই প্রতিবেদনটির একটা মূল ভিত্তিই ছিল তৎকালীন যৌথ বাহিনীর হাতে আটক ও নির্যাতিত রাজনীতি-ব্যবসায়ীদের স্বীকারোক্তি। তাদের স্বীকারোক্তির উপর ভিত্তি করেই যেন বদলে গিয়েছিল প্রথম আলোর শব্দ নির্বাচনের ধরণ, “দূর্নীতিপরায়ন” থেকে এক লাফে তারা চলে গিয়েছিল “দূর্নীতিবাজ”-এ। সেসব স্বীকারোক্তিকে গভীর ভাবে আমলে নিয়েছিল বলেই সেসময়ে প্রথম আলোতে অনেক রাজনৈতিক নেতার (শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া সমেত) বিরুদ্ধে খোলাখুলি ভাবে কলম ধরাধরি চলেছিল।

সে সময়ে সম্পাদিত সবগুলো পাপের ব্যাখ্যস্বরূপ মতিউর রহমান একটি কথাই বলেছেন বলে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে- চাপে পড়ে তখন তাকে অনেক কিছু করতে হয়েছে। এই চাপে পড়বার ব্যাপারটিই বা কতটা গ্রহণযোগ্য? তিনি কতদিন ধরে চাপে পড়ে ছিলেন? কিসের ভিত্তিতে তাকে চাপে ফেলা হল? তার কী কোন বিশেষ দুর্বলতা ছিল? যদি না-ই থেকে থাকে, তবে তিনি ঐ অতগুলো মাস চাপের মধ্যে থেকেই শুধু যা মনে আসল লিখে গেলেন? কোনটি সত্য?

আর তা যদি মেনে নিতেই হয়, তাহলে আমরা এই জেষ্ঠ্য সাংবাদিকের দৃঢ়তা সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করব? বর্তমানে ও ভবিষ্যতেই বা তার বিশ্বাসযোগ্যতার ব্যাপারে কতটা নিশ্চিন্ত থাকব? সেসময়ে তো বাংলাদেশে এমন কিছু ব্যাক্তিত্বও ছিলেন, যারা দেশে বসবাস করেই একাধিক গণমাধ্যমে ১/১১ সরকারের সাংবিধানিক বৈধতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতেন, তাদের বেআইনী কর্মকান্ডের একটিরও সমালোচনা করতে ছাড়েন নি। সম্পাদক নুরুল কবীর, আইনজীবি ব্যারিস্টার রফিকুল হক, অবসরপ্রাপ্ত আমলা আসাফউদ্দৌলা প্রমুখ নাম গুলো কি আমরা ভুলে গেছি? তারাই তো দেশে অবস্থান করেও, সরকারের দমনমূলক মনোভাব উপেক্ষা করে তাদের অপকর্মের কথা একের পর এক ফাঁস করে গিয়েছেন। বহুল প্রচারিত দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান তবে কেন পারেন নি? কেন তার পত্রিকাকে কিছু সেনা কর্মকর্তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে হয়েছিল? এরপরও সেনা কর্মকর্তাদের রাজনীতিতে প্রবেশের ঘটনার সমালোচনা প্রকাশ করার কোন নৈতিক অধিকার কি প্রথম আলোর থাকে? সাংবাদিক হিসেবে মতিউর রহমানের ও পত্রিকা হিসেবে প্রথম আলোর সততাই বা এখন কতটা প্রশ্নাতীত?

http://firstcache.files.wordpress.com/2010/09/paapology.jpg

মহানবী (সঃ)-এর কার্টুন এঁকে তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে প্রথম আলো সম্পাদক জাতীয় মসজিদের খতিব ওবায়দুল হক সাহেবের কাছে করজোরে ক্ষমা চাচ্ছেন। কথিত আছে, ঐ জটিল পরিস্থিতিতে পিঠ বাঁচানোর জন্য প্রথম আলোর ঊর্দ্ধতনেরা সাংবাদিক ইউনিয়নের জাতীয়তাবাদী অংশটির নেতৃবৃন্দের শরণাপন্ন হয়েছিলেন।

যে সরকারের বিশেষ উদ্দেশ্যে গঠিত যৌথ বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদের ফলাফলের উপর ভিত্তি করে মতিউর রহমান অত বড় বড় মন্তব্য প্রতিবেদনগুলো লিখেছিলেন, পরে আতান্তরে পড়ে নিজের সমস্ত কর্মের দোষ তিনি চাপিয়েছেন সেই সরকারের ঘাড়েই। অর্থাৎ এক সময়ে যেসব তথ্যের উপর ভিত্তি করে প্রথম আলো রাজনীতিবিদদের নিয়ে লম্বা লম্বা প্রতিবেদন ছেপেছিল, তাদের সম্পাদক সেই ভিত্তিগুলোকেই অস্বীকার করে নিলেন। সেই সময়ে অনেক রাজনীতিবিদও যারা শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন, পরে তারা স্বীকার করেছেন তারাও অনেকেই চাপে পড়েই করেছেন সেসব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোন একবার বলেওছিলেন, তার দলের নেতাদের তিনি তখনই বলে দিয়েছিলেন যে ১/১১ সরকার নির্যাতন করলে নেতাকর্মীরা যেন নিজেদের বাঁচাতে সরকার যা শুনতে চায় তাই বলে দেয়। মতিউর রহমানের মতে তিনিও নিজেকে বাঁচাতে সেই সরকারের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। তাহলে আমরা কি ধরে নিব যে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে লেখা প্রথম আলোর প্রতিটি শব্দই ছিল আসলে নিজেদের বাঁচাতে সেনানিবাস থেকে পরিচালিত সেই অগণতান্ত্রিক সরকারের খুশিমতন রচিত গল্প ও উপন্যাস।

১/১১ সরকারের সময়ে পালিত বিশেষ ভূমিকার জন্য গতকালই সংসদ অধিবেশনে প্রথম আলোর উপর দিয়ে এক চোট ঝড়-ঝাপটা বয়ে গেল। একাধিক মন্ত্রী ও এমপি প্রথম আলো পত্রিকার, বিশেষ করে সম্পাদক মতিউর রহমানকে জবাবদিহি করার জন্য স্পিকার কাছে আর্জি জানান। এই প্রসঙ্গে স্পিকার বলেন, বিশেষ বিষয়ে নিয়ে লেখার আগে তার সাথে প্রথম আলো প্রতিবেদকের আলোচনা করা উচিত ছিল, যেটি তাদের কেউ করে নি। স্পিকার আরও বলেন যে পরে সে বিষয়ে প্রতিবাদ জানালেও প্রথম আলোতে তা পুরোপুরি ছাপা হয় নি। এই পর্যায়ে কোন কোন সংসদ সদস্য উঠে দাঁড়িয়ে ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার পেছনে মতিউর রহমানকে দায়ী করতে থাকেন ও তার বিচার দাবী করেন। মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী মতিউর রহমানের বিপুল সম্পত্তির উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। শাহজাহান খান সহ অন্যান্য একাধিক মন্ত্রী প্রথম আলোর বর্তমান ভূমিকাকে আরেকটি ১/১১ ডেকে আনার ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই পর্যায়ে সংসদ সদস্যরা সরব হয়ে দাবীটির প্রতি সমর্থন জানান। অবশ্য মন্ত্রী ও এমপিদের আক্রমণের শিকার শুধু প্রথম আলোকেই নয়, আমাদের সময় ও সমকালকেও হতে হয়েছে। বিশেষ করে আমাদের সময়ের কোন প্রতিবেদনে ব্যবহৃত শব্দের ব্যাপারে স্পিকার আপত্তি জানিয়েছেন।

ওয়ান ইলেভেন সরকার ও সেসময়কার প্রথম আলোকে নিয়ে এত কথা বলার কারণ নিশ্চয়ই আছে। ‘সেসময়ে’ যে প্রথম আলো একটি অঘোষিত সেনাশাসিত সরকারের সমর্থনে টানা দুটি বছর ভূমিকা পালন করে গিয়েছে, একজন সেনা কর্মকর্তার রাজনীতিবিদে রূপান্তরের সমালোচনা করার ক্ষেত্রে প্রথম আলোর কতটুকু নৈতিক অধিকার অবশিষ্ট থাকে? আমরা বারবার বলছি প্রথম আলো সেসময়ে বিতর্কিত ভূমিকা পালন করেছিল। ভূমিকাটি কি এখনও বিতর্কিত আছে? মতিউর রহমানের ক্ষমাপ্রার্থনার মধ্য দিয়ে কি এটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়নি যে তার অধীনে প্রথম আলো সেনাসমর্থিত ও অগণতান্ত্রিক সেই সরকারের সমর্থনে কাজ করেছিল? এই প্রতিষ্ঠিত সত্যটিকে একপাশে সরিয়ে রেখে পত্রিকাটির কর্মীরা অন্যান্য সেনা কর্মকর্তাদের রাজনীতিতে প্রবেশের ব্যাপারে বক্র মন্তব্য করবেন, এটি কতটা গ্রহণযোগ্য হবে? দূরতম অতীতে ঘটে যাওয়া সেনা কর্মকর্তাদের রাজনীতিতে প্রবেশের ঘটনার সমালোচনা করার আগে কি তাদের উচিত হবে না অদূর অতীতে তাদের নিজেদেরই সেটি সমর্থন করার ঘটনার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া?

এই পর্যায়ে মিজানুর রহমান খান বলতে পারেন, তিনি শুধু সেনা কর্মকর্তার রাজনীতিতে প্রবেশের ঘটনার উল্লেখ করেছেন, একজন সাংবাদিক যেভাবে তথ্য উপস্থাপন করে ঠিক সেভাবে। এটা বলে থাকলে তা ভুল হবে না। পুরো প্রতিবেদনে তিনি একবারও সেনা কর্মকর্তার রাজনীতিতে প্রবেশের কোন সমালোচনা বা প্রশংসা করেননি। প্রাসঙ্গিক যেসব তথ্য তিনি যেখান থেকেই পেয়েছেন, তিনি সেগুলো উল্লেখ করেছেন মাত্র। এই পরিস্থিতিতে সমালোচনার প্রসঙ্গটি আসছে এ কারনে যে, সেনা কর্মকর্তার রাজনীতিতে প্রবেশের ব্যাপারে মিজানুর রহমান খানের উল্লিখিতি বিবরণকে যদি কেউ সমালোচনা হিসেবে নিয়ে থাকেন, তবে তার জেনে রাখা উচিত হবে যে এই বিবরণের প্রকাশস্থল পত্রিকাটি নিজেই দীর্ঘদিন যাবত একটি সেনাসমর্থিত অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক সরকারের সমর্থনে সক্রিয় থেকেছে, এবং পরে এই ব্যাপারে পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকারপ্রধানের সরাসরি প্রশ্নের মুখে সেই ভূমিকার জন্য মাপ চেয়ে সেই গণতান্ত্রিক সরকারপ্রধানের উষ্মা থেকে তাৎক্ষণাতের জন্য রক্ষা পেয়েছে।

http://firstcache.files.wordpress.com/2010/09/matiur-rahman-apologised-to-pm-for-dishonest-role-amid-1-11.jpg

নোয়াব-এর নেতাদের সামনে প্রধানমন্ত্রী ১/১১-এ প্রথম আলোর বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য দেয়ার সময় মতিউর রহমানের দিকে আঙ্গুল তুলে ধরেন। হতবুদ্ধি মতিউর রহমান "চাপে পড়ে করেছি" বলে সব পাপ ঝেড়ে ফেলবার প্রচেষ্টা চালান।

এক্ষেত্রে প্রথম আলোর একটি অনন্য বৈশিষ্ট্যের উপর আলোকপাত করতেই হচ্ছে। প্রথম আলোর একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- কখনও বিদেশী লেখক ও সাংবাদিকদের বই ও সাক্ষাৎকার, কখনও মার্কিন সরকারের অবমুক্ত করা কোন গোপন দলিলপত্র ব্যবহার করে কিংবা কোন মৃতব্যাক্তিকে উদ্ধৃত করে চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ করা। প্রথম আলোর প্রতিবেদকরা খুব ভালো করেই জানেন- প্রাথমিক উৎস থেকে সংগ্রহ করে সেসব দলিলপত্রে উল্লিখিত তথ্যগুলোর সরবরাহকারীরা প্রধানত হচ্ছেন সংস্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোতে নিযুক্ত কূটনীতিকেরা। সেসব কূটনীতিকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও সরবরাহকৃত তথ্যের ধরণ যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের উপর পুরোপুরি ভাবে নির্ভর করে, এই বাস্তবতাটুকু প্রথম আলোর প্রতিবেদকদের না জানবার কথা না। তো, শেষ পর্যন্ত প্রথম আলোর এই বৈশিষ্ট্যটির হয়তো সমালোচনা করা যেত না। কিন্তু অসুবিধা হচ্ছে, এসব লেখা বা দলিলের বেশীরভাগই একপেশে। আরও দুঃখের ব্যপার হচ্ছে, এরকম ক্ষেত্রে প্রথম আলোর নিজেদের পক্ষ থেকে তদন্তের চেষ্টা করার লক্ষণ খুব সহজে দেখা যায় না।

একটি কথা বলে শেষ করতে চাই। ১/১১-এর সময়ে প্রথম আলোর বিতর্কিত ভূমিকা ও পরে প্রধানমন্ত্রীর সম্মুখে তার জন্য মাপ চাওয়ার ঘটনায় মূলত যে বাস্তবতাটা উপলব্ধি করা যায়, সেটি হচ্ছে- প্রথম আলো ইতমধ্যেই অনেক পাঠকের কাছেই এমন একটি পত্রিকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে যেটি ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর রাজনৈতিক আচরণ মোতাবেক নিজেদের নীতির এদিক সেদিক করে থাকে। এক্ষেত্রে সরকারটি গণতান্ত্রিক না অগণতান্ত্রিক, সরকারের কোন সাংবিধানিক বৈধতা আছে কি নেই, তারা সেসব বিচার করে না, করার কথা না। সেক্ষেত্রে, একজন নিতান্তই সাধারণ ও সাদামাটা পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জানতে চাওয়া যেতে পারে যে, সেই মাপ চাওয়ার ঘটনার পর আবারও কি পত্রিকাটি ক্ষেত্রবিশেষে এমন কোন ভূমিকা পালন করছে যার জন্য পরবর্তী কোন ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনের অধিকারী সরকারপ্রধানের উষ্মা থেকে বাঁচবার জন্য তাদেরকে তার পূর্ববর্তী সরকারকে দায়ী করে বিতর্কিত ভূমিকার জন্য মাপ চাইতে হবে?


Responses

  1. hi friends comilla be nice


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

Categories

%d bloggers like this: