Posted by: xanthis | January 27, 2011

ডেইলি স্টারের ‘দ্যাট বিজনেসম্যান’ ও সালমান এফ. রহমান

http://firstcache.files.wordpress.com/2011/01/daily-star-vs-salman-f-rahman-over-stock-collapse-500px.jpg

খবরটি গত সোমবার ডেইলি স্টার পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল প্রথম পাতায়। পুঁজিবাজারে সরকারদলীয় রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের দুর্নীতির আলোচনা তুঙ্গে থাকা বর্তমান সময়ে ডেইলি স্টারের ঐ বিশেষ খবরটিতে যেন ছিল চুম্বকার্ষণ। কিংবা তার চেয়েও বেশি কিছু। অবশেষে খবর প্রকাশের দিনের শেষ ভাগে সালমান এফ. রহমান এটিএন নিউজে এক সাক্ষাতকার দেয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতিতে একটি অন্য মাত্রা যোগ করেছেন।

 

কী ছিল ঐ রিপোর্টটিতে

রিপোর্টের শিরোনাম- All fingers pointed at one man. অত্যন্ত সতর্কতার সাথে লেখা রিপোর্টটিতে একটি বারের জন্যেও কোন বিশেষ প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ীর নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে রিপোর্টের অর্ধেকের বেশি অংশ জুড়েই রয়েছে ঐ ব্যবসায়ীর পরিচয়। তাকে পরিচয় করিয়ে দিতে ব্যবহৃত বিশেষণ ও উল্লেখগুলো হল- তিনি ক্ষমতাসীন দলের এমপি, দলে প্রভাবশালী, তার প্রতিষ্ঠান কয়েক বছর আগেও ঋণের ভারে জর্জরিত ছিল, কর্মীদের বেতন দিতে পারত না, কিন্তু ২০০৯-এর মাঝামাঝি থেকে তারা দেশের একটার পর একটা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নিতে শুরু করে। পরিচয় পর্বে এও বলা হয়, ১৯৯৬ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারিতেও এই ব্যবসায়ী জড়িত ছিলেন, কিন্ত ‘পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাব’-এর অজুহাত দেখিয়ে সরকার তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয় নি।

http://shatil.files.wordpress.com/2011/01/fm-meet-on-stock-collapse-2-600px.jpg

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সূচকের অস্বাভাবিক পতন বিষয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘পদ্মা’-তে অর্থ মন্ত্রী এ.এম.এ. মুহিতের সাথে কিছু অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীর ঐ বৈঠকে এই বিশেষ ব্যাক্তির ভূমিকা প্রসঙ্গে বলা হয়, বৈঠকে অংশ নেয়া একাধিক ব্যাক্তি স্টক এক্সচেঞ্জের ঐ বিপর্যয়ের জন্য ঐ ব্যবসায়ীকে দায়ী করেন। জবাবে ব্যবসায়ী জানান তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী এবং এহেন সম্বোধনে তিনি অপমানিত হয়েছেন। এতে বৈঠকে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে অর্থ মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তা স্বাভাবিক হয়।

 

এটিএন নিউজে সালমান এফ. রহমানের সাক্ষাতকার

সোমবার রাতে এটিএন নিউজের স্টুডিওতে এসে মুন্নি সাহাকে সালমান এফ. রহমান একটি সাক্ষাৎকার দেন। স্টক মার্কেট কলাপস নিয়ে বাতাসে উড়তে থাকা খবর যেগুলোর অধিকাংশের সাথে প্রধানমন্ত্রী পরিবারের একাধিক সদস্যের নামের পাশাপাশি সালমান এফ. রহমানের নামটিও জড়িয়ে আছে, সেই খবরগুলো প্রসঙ্গে মুন্নি সাহা সালমান এফ. রহমানের কাছে জানতে চান। নরমে-গরমে, হেসে কিংবা কখনও ক্ষেপে সালমান এফ. রহমান সেগুলোর জবাব দেন। তার বেক্সিমকো ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত সাত বছর ধরে জমতে থাকা ঋণের বোঝার পুরোটা মিটিয়ে দিয়েছে, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের এমন খবরের প্রতিবাদ করে তিনি বলেন, তারা যখন ঐ খবরটি করে তখনও ঋণ পুরোটা মিটানো হয়নি। উল্লেখিত সময়ে তার প্রতিষ্ঠানের দূরবস্থার কথা স্বীকার করে তিনি যোগ করেন, এমনও হয়েছে যে ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে তিনি বাকি কর্মীদের বেতন দিয়েছেন। কীভাবে প্রতিষ্ঠানটি রাতারাতি এখনকার মত নধর আকৃতি পেয়ে গেল, মুন্নি সাহার এই প্রশ্নের জবাব তিনি এভাবে দেন- কোম্পানির ভিত্তি বরাবরই শক্ত ছিল, অগণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পর তার পরিবারের সক্রিয় সদস্যরা বিদেশ থেকে ফিরে এসে ব্যবসার হাল ধরে, তিনিও জেল থেকে বেরিয়ে এসে সক্রিয় হন।

http://shatil.files.wordpress.com/2011/01/fm-meet-on-stock-collapse-1-600px.jpg

ঋণের ভারে জর্জরিত একটি প্রতিষ্ঠান রেকর্ড পরিমাণ ঋণ উৎরে শুধু মাত্র পারিবারিক পুনর্মিলনীর দিয়ে কয়েক বছরের মাঝে জিএমজি এয়ারলাইন্স, ওয়েস্টিন হোটেল, বিডিনিউজ২৪-এর মালিকানা কীভাবে পেতে পারে, মুন্নি সাহা সালমান এফ. রহমানকে এই প্রশ্ন করে বিব্রত করেননি।

ডেইলি স্টার প্রথম আলো-র সাথে সালমান এফ. রহমানের একটি ‘মেক্সিকান স্ট্যান্ডঅফ’ ঘটেছিল প্রায় এক বছর আগে। ঋণে জর্জরিত অবস্থা থেকে সালমান এফ. রহমানের প্রতিষ্ঠানের উত্তরোত্তর উত্তরণকে প্রশ্ন করে কয়েকটি রিপোর্ট ছাপে প্রথম আলো। তার জবাবে সালমান এফ. রহমান সাংবাদিক সম্মেলন করে জানান প্রথম আলো ডেইলী স্টার বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্থ করার চেষ্টা করছে, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে চাইছে। তিনি ওয়ান-ইলেভেনওয়ালাদের সাথে প্রথম আলো ডেইলী স্টারের সুসম্পর্কের কথাটি উল্লেখ করেন, এবং মাইনাস-টু ফর্মুলার প্রণেতা হিসেবে তাদেরকে চিহ্নিত করেন। তার জবাবে ডেইলি স্টার সম্পাদক ও প্রথম আলো প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, “একজন বছরের পর বছর ঋণ খেলাপ করে যাবে, কেউ তা নিয়ে কিছু বলতে পারবে না? সালমান এফ. রহমান এমন কী মানুষ যার সমালোচনা করলে সরকার অস্থিতিশীল হয়ে যাবে?” মেক্সিকান স্ট্যান্ডঅফই বটে!

সেই দিকগুলো সাম্প্রতিক স্টক মার্কেট কোলাপসের মধ্য দিয়ে যেন আরেকটু উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ডেইলি স্টার তার গোটা রিপোর্টে কোথাও সালমান এফ. রহমান বা বেক্সিমকোর নাম উল্লেখ করে নি, তবে এটিএন নিউজের সাক্ষাৎকারে সালমান এফ. অম্লানবদনে ডেইলী স্টারের ‘ঐ বিশেষ ব্যবসায়ী’ হিসেবে নিজেকে চিহ্নিত করে রিপোর্টটির সমালোচনা করেছেন। তিনি রিপোর্টটির ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন করেন এবং কয়েকটি ঘটনা বিকৃত ভাবে তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান। যেমন- ডেইলী স্টার বলছে বৈঠকের একজন অংশগ্রহণকারী কলাপসের জন্য সালমান এফ. রহমানকে দায়ী করলে কথা কাটাকাটি শুরু হয় ও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে, যা নিরসনে অর্থ মন্ত্রী এগিয়ে আসেন। সালমান এফ. রহমান জানান ওরকম কিছুই সেখানে ঘটেনি। বৈঠকের এক পর্যায়ে তাকে ও তার প্রতিষ্ঠানকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা হয় স্বীকার করে তিনি জানান, তিনি সেখানে তোলা প্রশ্নগুলোর এক এক করে জবাব দেন। তবে তিনি স্বীকার করেন যে জবাব দিতে গিয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি ‘এক্সাইটেড’ হয়ে পড়েন। সম্ভবত চেঁচিয়ে উত্তর দেয়ার ব্যাপারটাকে তিনি ‘এক্সাইটেড’ দিয়ে প্রকাশ করেছেন। তিনি যোগ করেন যে বৈঠকের শেষে কয়েকজন ব্যাক্তি তাকে জানিয়েছেন যে তার জবাব খুব ভালো হয়েছে, তবে আরেকটু নিম্নস্বরে ঠান্ডা মাথায় জবাব দিলে ভালো করতেন।

 

‘ইয়োর রাইট টু ন্যো’ ও ঢাক ঢাক গূঢ় গূঢ়-এর সহাবস্থান

‘ইয়োর রাইট টু ন্যো’-কে ডেইলি স্টার তাদের শ্লোগান হিসেবে বেঁছে নিয়েছে, যেমন বেঁছে নিয়েছে নিউ এজ ‘বায়াসড ট্যুয়ার্ডস পিপল’-কে। শ্লোগানগুলো সৎ, সত্যনিষ্ঠ ও দায়িত্মশীল সাংবাদিকতার প্রতীক। পত্রিকা হিসেবে ডেইলি স্টার বহুলপঠিত। চলমান ঘটনা ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর উপর খবর জানতে পত্রিকাটি বহু মানুষের জন্যই প্রাথমিক ও একমাত্র উৎস। সেই বিচারে বহু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির উপর প্রভাব ফেলার ক্ষমতা ও যোগ্যতা, দুইই পত্রিকাটির আছে। এই ক্ষমতা অতীতে তারা ব্যবহারও করেছে। এই ব্যবহার তাদেরকে বহুলপ্রচারিত প্রশংসা ও বহুলপ্রচারিত তিরষ্কার, দুইই এনে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সত্য প্রকাশে তাদের অপারগতার বিষয়টি আপত্তিজনক তো বটেই, অত্যন্ত হতাশাজনকও। ‘All fingers pointed at one man’ শীর্ষক রিপোর্টটিতে তাদের শ্লোগানকে আংশিক ভাবে অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের ওয়েবসাইটে রিপোর্টটির নীচে পাঠক মন্তব্য পড়লে ব্যাপারটি আরও স্পষ্ঠ হয়ে উঠবে। প্রথম পাঠক মন্তব্যটিতেই এই ‘ঢাক ঢাক গূঢ় গূঢ়’ অবস্থানের সমালোচনা করে একে অগ্রহণযোগ্য আচরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

কয়েক বছর আগে পত্রিকাটির সম্পাদক মাহফুজ আনাম একটি টিভি সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, “সালমান এফ. রহমান এমন কী মানুষ যার সমালোচনা করলে সরকার অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে?”। এই কথাটি মনে রেখে ডেইলি স্টারের ঐ রিপোর্টটি পড়লে একজন পাঠকের মনে হতেই পারে, অবশেষে ডেইলি স্টারের দৃষ্টিতে সালমান এফ. রহমান কি এমন কোন ব্যাক্তি হয়ে উঠেছেন যার সমালোচনা করলে তারা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আশংকা করছেন?


Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

Categories

%d bloggers like this: